ভোট রাজনীতিতে মত্ত কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী শিক্ষকেরা





সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: 

ভোট আগে, না জীবন আগে! পরীক্ষা আগে, না ভোট আগে! করোনা আবহে শিক্ষকদের জীবন বাজি রেখে ভোট রাজনীতিতে মত্ত কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী শিক্ষকেরা।
করোনা সংক্রমণের তীব্র প্রকোপ ও শিক্ষকদের স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে শিক্ষকদের জীবনকে বাজি রেখে করোনা আবহেই শিক্ষক সমিতির নির্বাচন করতে যুক্তিহীনভাবে অনড় কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী শিক্ষকেরা। করোনা মহামারী থেকে মড়কের রূপ নিয়েছে। এই আবহেই ভোট করার অতি সক্রিয়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইতিমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নির্বাচনী নির্ঘণ্ট‌ও প্রকাশ করে দিয়েছে বিদায়ী কর্মসমিতির তরফ থেকে প্রিসাইডিং অফিসার অধ্যাপক তারকদাস বসু।

এই ভোটের বিরোধিতা করতে যুক্তিসঙ্গতভাবে এগিয়ে এসেছে তৃণমূল সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা। করোনাকালীন মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সময়ে ভোট করতে তারা নারাজ। উল্লেখ্য, সমিতির গতবারের নির্বাচনে নির্বাচিত অধিকাংশ শিক্ষক‌ই বামপন্থী মনোভাবাপন্ন। করোনা আবহে বামপন্থী শিক্ষকেরা বিরোধী শিক্ষকদের অনুপস্থিতিকেই কাজে লাগাতে চাইছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। আরোও অভিযোগ, সংগঠনের কিছু সদস্য নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার অভিসন্ধির জন্য‌ই হঠাৎ করেই নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করছে বলে শোনা যাচ্ছে। 


এই শিক্ষক সমিতির মেয়াদ এক বৎসর কাল। প্রিসাইডিং অফিসার দ্বারা প্রকাশিত নির্বাচনী নির্ঘণ্ট অনুযায়ী এই নির্বাচন হবে অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী করোনার জন্য ৩০ শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। অথচ ভোটের যে নির্ঘণ্ট প্রকাশিত হয়েছে তার বেশিরভাগ কর্মকাণ্ড এই ছুটির আবহেই।  বেশকিছু শিক্ষক এবং কয়েকটি শিক্ষক সংগঠন বিষয়টি নিয়ে বিরোধীতা করে সোচ্চার হয়ে তাঁরা স্থানীয় প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অবগত‌ও করেছেন। তা সত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের পদক্ষেপ এখন অব্দি নেয়নি বলে খবর। করোনাকালীন আবহে অতিমারীর যে আইন বলবৎ রয়েছে, সেই মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির বিদায়ী কমিটি  নির্বাচন পরিচালনার জন্য কোন ধরনের অনুমতি নেয়নি বলে সূত্রের খবর। অনুমতি না নিয়েই নির্বাচনে নির্ঘণ্ট  প্রকাশ করেছে, যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অন্দরে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পরিস্থিতিতে আদৌ নির্বাচন পরিচালনা যায় কিনা সেটাই এখন বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

করোনাকালীন আবহে স্বাস্থ্যবিধির কথা মাথায় রেখে এবং রাজ্য সরকারের অনুমতি ব্যতীত কেইউটিসি'র নির্বাচন পরিচালনার হঠকারী সিদ্ধান্ত শিক্ষক সমাজকে ভয়ঙ্কর বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা। উল্লেখ্য, করোনা আবহে ইতিমধ্যে পুরসভার নির্বাচন‌ও স্থগিত রয়েছে। তারপর ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হবে। 

স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে অতিমারীর সময়ে অধিকাংশ শিক্ষক‌ই বর্তমানে নিজ নিজ বাড়িতে বা দূর-দূরান্তে রয়েছেন। রাজ্যে যানবাহন ব্যবস্থাও এখনও অবধি স্বাভাবিক নয়। যে সমস্ত শিক্ষক উত্তরবঙ্গ বা কয়েকশো কিলোমিটার দূরে আছেন, তাঁদের পক্ষে বর্তমান সময়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মোটেই সম্ভবপর নয়। 

অন্যদিকে আরেকটি বিধিবদ্ধ জটিলতা দেখা দিয়েছে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে। কর্মসমিতি ও সাধারণ সভায় আলোচনা না করে অধ্যাপক তারকদাস বসু একক সিদ্ধান্তে এই নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেছে, যা অগণতান্ত্রিক। কাজেই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে কোন ধরনের আলোচনাই হয়নি। বিধি অনুসারে এক বৎসর মেয়াদকালের মধ্যেই বার্ষিক সাধারন সভা ডেকে হিসাব পেশ করতে হবে এবং নির্বাচনে নির্ঘণ্ট চূড়ান্ত হবে। এতদিন এই রীতিই অনুসরণ করা হয়েছে বলে শিক্ষকেরা দাবি করছেন।

অন্যদিকে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী অক্টোবর মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সমূহের নিয়ামক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেকথাও জানিয়েছে। অথচ এই সময়কালের মধ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত রকম মনোনয়নপত্র পেশ, স্ক্রুটিনি এই কাজগুলি হবে বলে নির্ঘণ্টতে প্রকাশ। ফলে এই সময়পর্বে শিক্ষকরা সকলেই ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা ও ফলাফল প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকবেন। তাহলে কিভাবে এই সময়কালে নির্বাচন  সম্ভব? ভোট আগে, না ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার আগে? এই প্রশ্ন‌ও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। 

স্বাস্থ্যবিধি উড়িয়ে এই নির্বাচন করার বিরুদ্ধে অধিকাংশ শিক্ষকেরা এবং তৃণমূল সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানালেও প্রিসাইডিং অফিসার অধ্যাপক তারকদাস বসু নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া যে সমস্ত শিক্ষক বর্তমানে সরকার ঘোষিত কন্টেন্টমেন্ট জোনে রয়েছেন, তাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হবেন। এমতো অবস্থায় কিভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব? শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বারংবার আবেদন জানিয়েও কর্তৃপক্ষ এখনো অব্দি কোন ধরনের সন্তোষজনক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এই ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমতি দেয়নি ঠিকই, তবে কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচনের বিরোধিতাও এখনো পর্যন্ত করেনি। 

সাধারণ শিক্ষকদের স্বাস্থ্যবিধির কথা ভেবে তৃণমূল সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা চিঠি দিয়ে বর্তমান সময়ে এই নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছেন। এছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে বেশ কিছু শিক্ষক চিঠি দিয়ে এই নির্বাচনে বিরোধিতা করেছেন। ওয়েবকুপার যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক নন্দকুমার ঘোষ ও অধ্যাপক সুজয়কুমার মণ্ডল বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা সাধারণ শিক্ষকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা ভেবে এই নির্বাচন পিছিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু অধ্যাপক তারকদাস বসু এই নির্বাচন পিছিয়ে দিতে আগ্রহী নন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এই নির্বাচন হবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে। প্রতিটি ভোটার সশরীরে নির্বাচন কক্ষে প্রবেশ করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এতেও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
এদিকে রাজ্যে পরিচালনার ক্ষেত্রে 'দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৫' কে অমান্য করে এমন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেন্দ্র সরকার বর্তমান অবস্থাকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এই মুহূর্তে সমস্ত ধরনের নির্বাচনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এমতাবস্থায় রাজ্য পরিচালনার পলিসিকে বিরোধিতা করে
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই বর্তমান নির্বাচনের আয়োজন।

রাজ্য সরকার যখন করোনার প্রকোপ থেকে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের রক্ষার তাগিদে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তখন এই নির্বাচন কিভাবে করা সম্ভব? কেইউটিসির সক্রিয় সদস্য এবং ওয়েবকুপা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক নন্দকুমার ঘোষ ও সুজয়কুমার মণ্ডল জানান, "করোনা অতিমারীর সময়ে সাধারণ শিক্ষকদের এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার আমরা বিরোধী। নির্বাচন হলে করোনার সংক্রমণ বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া দূর-দূরান্তের শিক্ষকেরাও এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। সব থেকে বড় কথা হল সমস্ত শিক্ষকের  সহমতের ভিত্তিতে এই নির্বাচন হচ্ছে না। বামপন্থীদের অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক এই প্রয়াসকে আমরা প্রতিহত করতে চাই। শিক্ষক  বিরোধী এই উদ্যোগকে আমরা ধিক্কার জানাচ্ছি"।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে একটু কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, বিগত এক বছরে বামপন্থী শিক্ষকরা যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তা পূরণে ব্যর্থ। অন্যদিকে প্রায় এক বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশনের যে জটিলতা রয়েছে তা সমাধান করার জন্য কোন ধরনের পদক্ষেপ তাঁরা নেননি।
রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের জন্য  সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি মাত্র মিটিং হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। সেই মিটিং-এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান হবে। কিন্তু যথাযথ সময়ে অর্থাৎ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনের যে সময়সীমা সেই এক বছরের মধ্যে সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করা হয়নি। উল্টে
নতুন নামে সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন করাতে উদ্যোগ নিয়েছিল বামপন্থী শিক্ষকেরা। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অগণতান্ত্রিকভাবে করোনা মড়কের সময় নির্বাচনে নির্ঘণ্ট  প্রকাশ করে ভোটে লড়তে চাইছে। দীর্ঘ এক বছর সময়কাল দায়িত্ব পাওয়ার পরেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের দাবিদাওয়া পূরণে ব্যর্থ হয়েছে কেইউটিসি। যে সমস্ত দাবি সনদকে হাতিয়ার করে ক্ষমতায় এসেছিল টিচার্স কাউন্সিল, সেই সমস্ত দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এই সংগঠন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নানান বেনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে  সোচ্চার হতে দেখা যায়নি বলে সূত্রের খবর। একমাত্র বায়োমেট্রিক আন্দোলনের সাফল্য ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের ব্যর্থতায় শিক্ষকদের কাছে প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে। সূত্রের আরো খবর অধিকাংশ  শিক্ষকদের মধ্যে এসব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। সংগঠনের ব্যঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে পড়েছিল দীর্ঘদিন। এই মহামারী কালীন মুহূর্তে সংগঠনের হেলথ ফাণ্ড থেকে শিক্ষকরা কোন ধরনের সহায়তা পায়নি। কোভিড ১৯ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণতহবিলের টাকা তুললেও তা জমা করতে পারেনি সংগঠন। প্রায় ছয় মাসের অধিক কাল ধরে সেই টাকা ব্যাংকের একাউন্টে পড়ে রয়েছে। সদস্যদের কাছ থেকে সদস্যপদের যে বার্ষিক চাঁদা তাও জমা করেনি ব্যাংকের একাউন্টে।  সব মিলিয়ে ব্যর্থতার দায়ভার লুকিয়ে এই করোনা আবহে নির্বাচন করে নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার অন্যায় প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট সমর্থিত সদস্যরা--- এ ধরনের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে উঠছে। এই বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে তৃণমূল সমর্থিত সংগঠন ওয়েবকুপা বর্তমান পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে যুক্তিসঙ্গতভাবে চরমভাবে বিরোধিতা করে যাচ্ছে এবং গণতান্ত্রিকভাবে তা প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে কি হয় সেটাই দেখার বিষয়।

0/Post a Comment/Comments

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com