কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভোটে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ





মহামারী অবস্থাতেই করোনাকালীন আবহে ভোট করতে উদ্যত হয়েছিল কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য গতবছর যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন অধিকাংশই বামপন্থী মনোভাবাপন্ন। বর্তমান অবস্থায় ভোট পরিচালনার বিরোধিতা করে সরব হয়েছিলেন ওয়েবকুপা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের শিক্ষকেরা। তাঁরা বারংবার মৌখিকভাবে এবং লিখিতভাবে ভোট পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালেও কোনো কর্ণপাত করেননি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি তথা স্বঘোষিত প্রিজাইডিং অফিসার তারকদাস বসু। 




কোন ধরনের সুরাহা না পেয়ে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক নন্দকুমার ঘোষ, পার্থসারথি দে ও সুজয়কুমার মণ্ডল গত ১৮ তারিখে কল্যাণী মহকুমা আদালতে টিচার্স কাউন্সিল নির্বাচনের প্রক্রিয়া স্থগিত করার জন্য আবেদন জানান। কল্যাণী আদালতের দেওয়ানী বিচারক সপ্তমীতা দাস এই আবেদনের সারবত্তা দেখে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভোটের উপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করেন। এই মামলার মামলাকারীদের পক্ষের আইনজীবী রানা চক্রবর্তী শনিবারের এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক সুজয়কুমার মণ্ডল, নন্দকুমার ঘোষ এবং পার্থসারথি দে আগামী ৯ অক্টোবরের টিচার্স কাউন্সিল নির্বাচন স্থগিত করার জন্য আদালতের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন না করার জন্য আদালত রায় দিয়েছে। এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক। পাশাপাশি সারা রাজ্যজুড়ে ভোট রাজনীতিতে এই রায় সাড়া ফেলে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই রায়ের সমর্থনে ইতিমধ্যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ট্রোলড হচ্ছে।




প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, করোনা মহামারী থেকে মড়কের রূপ নিয়েছে। এই আবহেই ভোট করার অতি সক্রিয়তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে, আলোচনা ব্যতীত‌ই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নির্বাচনী নির্ঘণ্ট‌ও প্রকাশ করে দিয়েছে সংগঠনটির তরফ থেকে  তারকদাস বসু।

বর্তমান সংকটকালে এই ভোটের বিরোধিতা করতে এগিয়ে আসে তৃণমূল সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা। করোনাকালীন মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সময়ে ভোট করতে তাঁরা নারাজ। এই নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি শিক্ষক সংগঠন অবুটা। তাঁরাও যুক্তি দিয়ে সমস্ত শিক্ষকদের অবগত করেন শিক্ষক সমিতির রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত জটিলতার প্রসঙ্গ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত নির্ঘণ্ট প্রকাশের অসঙ্গতি।  করোনা আবহে বামপন্থী শিক্ষকেরা বিরোধী শিক্ষকদের অনুপস্থিতিকেই কাজে লাগাতে চাইছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। আরোও অভিযোগ, সংগঠনের কিছু সদস্য নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার অভিসন্ধির জন্য‌ই নির্বাচনের তোড়জোড় করছে বলে শোনা যাচ্ছে। 




বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে একটু কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, বিগতে বছরে বামপন্থী শিক্ষকেরা শিক্ষক সমাজকে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন করেছিল তা পূরণে ব্যর্থ। অন্যদিকে প্রায় এক বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশনের যে জটিলতা রয়েছে তাও তাঁরা সমাধান করতে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কোনো নথি সমিতির দপ্তরে নেই, এমনকি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের কপিও নেই। পশ্চিমবঙ্গ সোসাইটি অ্যাক্ট অনুসারে বার্ষিক অডিট রিপোর্ট নির্দিষ্ট দপ্তরে জমা পড়েনি দীর্ঘদিন ধরে। অধিকাংশ শিক্ষকেরাও প্রশ্ন তুলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তো বামপন্থীরাই শিক্ষক সমিতির পরিচালনা করেছেন। তাহলে তাঁরা এতদিন ধরে কি করেছেন?এই সমস্ত নথি তাঁরা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করেননি বলে  অভিযোগ ।  উল্লেখ্য, রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে
মিটিং হয়েছিল। সেই মিটিং-এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করা হবে। কিন্তু যথাযথ সময়ে অর্থাৎ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনের যে সময় সীমা সেই এক বছরের মধ্যে সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান হয়নি। উল্টে
নতুন নামে সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন করাতে চেয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অগণতান্ত্রিকভাবে করোনা মোড়কের সময় নির্বাচনে নির্ঘণ্ট  প্রকাশ করে ভোটে লড়তে চাইছে বলে সূত্রের খবর। দীর্ঘ এক বছর সময়কাল দায়িত্ব পাওয়ার পরেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের দাবিদাওয়া পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বিদায়ী কর্মসমিতির কর্তারা। যে সমস্ত দাবি সনদকে হাতিয়ার করে ক্ষমতায় এসেছিল টিচার্স কাউন্সিল, সেই সমস্ত দাবিগুলি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এই সংগঠন। তাই এখন ক্ষমতাই টিকে থাকতে ভোটের রাজনীতিই বামপন্থীদের হাতিয়ার বলে শোনা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় অন্দরে গুঞ্জন হচ্ছে এই বলে যে মুষ্টিমেয় বামপন্থী শিক্ষকেরা যেনতেন প্রকারে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে  হবেই বলে পণ করেছেন।

এই শিক্ষক সমিতির মেয়াদ এক বৎসর কাল। প্রিসাইডিং অফিসার দ্বারা প্রকাশিত নির্বাচনী নির্ঘণ্ট অনুযায়ী এই নির্বাচন হবার কথা ছিল অক্টোবর মাসের ৯ তারিখ। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী করোনার জন্য ৩০ শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা রয়েছে। অথচ ভোটের যে নির্ঘণ্ট প্রকাশিত হয়েছে তার বেশিরভাগ কর্মকাণ্ড এই ছুটির আবহেই। ভোটের দিন নির্ধারিত ছিল ৯ অক্টোবর। বেশকিছু শিক্ষক এবং কয়েকটি সংগঠন বিষয়টি নিয়ে বিরোধীতা করে সোচ্চার হয়ে তাঁরা স্থানীয় প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অবগত‌ও করেছেন। তা সত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়ায় ওই তিন শিক্ষক আদালতের দ্বারস্থ হন। 

করোনাকালীন আবহে অতিমারীর যে আইন বলবৎ রয়েছে, সেই মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সংগঠন নির্বাচন পরিচালনার জন্য কোন ধরনের অনুমতি নেয়নি বলে সূত্রের খবর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পরিস্থিতিতে আদৌ নির্বাচন পরিচালনা যায় কিনা সেটা নিয়েও শিক্ষিত মহলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমেও কেইউটিসি নির্বাচন বেশ চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শোনা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে অতিমারীর সময়ে অধিকাংশ শিক্ষক‌ই বর্তমানে নিজ নিজ বাড়িতে বা দূর-দূরান্তে রয়েছেন। রাজ্যে যানবাহন ব্যবস্থাও এখনও অবধি স্বাভাবিক নয়। যে সমস্ত শিক্ষক উত্তরবঙ্গ বা কয়েকশো কিলোমিটার দূরে আছেন, তাঁদের পক্ষে বর্তমান সময়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মোটেই সম্ভব নয়। 

তাছাড়া মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী অক্টোবর মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সমূহের নিয়ামক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেকথাও জানিয়েছে। অথচ এই সময়কালের মধ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত রকম মনোনয়নপত্র পেশ, স্ক্রুটিনি এই কাজগুলি হবে বলে নির্ঘণ্টতে প্রকাশ। ফলে এই সময়পর্বে শিক্ষকরা সকলেই ফলাফল প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকবেন। তাহলে কিভাবে এই সময়কালে নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব? এই প্রশ্ন‌ও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। 

স্বাস্থ্যবিধি উড়িয়ে এই নির্বাচন করার বিরুদ্ধে শিক্ষকরা এবং তৃণমূল সমর্থিত শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা প্রতিবাদ জানালেও প্রিসাইডিং অফিসার  তারকদাস বসু নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া যে সমস্ত শিক্ষক বর্তমানে সরকার ঘোষিত কন্টেন্টমেন্ট জোনে রয়েছেন, তাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হবেন। এমতো অবস্থায় কিভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব? শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বারংবার আবেদন জানিয়েও কর্তৃপক্ষ এখনো অব্দি কোন ধরনের সন্তোষজনক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এই ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমতি দেয়নি ঠিকই, তবে কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচনের বিরোধিতাও এখনো পর্যন্ত করেনি। 

শিক্ষক ত্রয়ীর পক্ষের উকিল রানা চক্রবর্তী এই সমস্ত যুক্তিকে সামনে রেখে বর্তমান নির্বাচন সংক্রান্ত নোটিশের ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের নির্দেশ চান। কল্যাণী মহাকুমা আদালতের বিচারক সপ্তমীতা দাস আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনের ভোটের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন।
এদিকে বাদী পক্ষের তিন শিক্ষক শনিবার একটি প্রেসমিটের আয়োজন করেন। সেখানে কয়েকজন শিক্ষক সহ উপস্থিত ছিলেন বাদী পক্ষের উকিল রানা চক্রবর্তী ও আমজাদ মন্ডল।
সাংবাদিকদের সামনে পার্থসারথি দে, নন্দকুমার ঘোষ এবং সুজয়কুমার মন্ডল জানান, আমরা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আমাদের অনুরোধকে গ্রাহ্য করা হয়নি। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সার্বিকভাবে বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই আশ্চর্যজনক লেগেছে। কেননা যেখানে সারা বিশ্বজুড়ে অতিমারির প্রকোপ সাংঘাতিকভাবে বেড়েছে, সেখানে এইরকম সংকটময় সময় কিভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব! তারপরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, অক্টোবর মাস জুড়ে পরীক্ষা — এইসব বিষয়গুলিকে মাথায় না রেখেই ক্ষমতায় থাকার অভিপ্সা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি না মেনে নির্বাচনের নির্ঘণ্টও প্রকাশ করে, যা একেবারেই বাস্তবোচিত নয়। স্বাভাবিকভাবেই  আমরা সাধারণ শিক্ষকদের স্বার্থ ও  বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের দিকে তাকিয়ে এই মামলা করি। মহামান্য আদালত আমাদের আবেদন গ্রহণ করেন এবং স্থগিতাদেশ দেন। স্বাভাবিকভাবেই এটা আমাদের নীতির জয়। শিক্ষকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত আমাদের অবস্থানের জয়। সর্বোপরি এই রায়ে সমস্ত শিক্ষকদের জয় হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।

0/Post a Comment/Comments

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com