সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটের উপর নির্ভর করছে প্রকল্পের কর্মচারীদের আগামী ভবিষ্যৎ



                                  নন্দ দুলাল দাস


আগামী 7, 8 আগস্ট '20 ভারত সরকারের অধীনে নিযুক্ত সমস্ত প্রকল্পের কর্মচারীদের দু'দিনব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট। ভারত সরকারের অধীনে নিযুক্ত যতগুলি প্রকল্প আছে সমস্ত প্রকল্পের  কর্মচারীবৃন্দের যৌথ আহবানে এই সাধারণ ধর্মঘট। এই ধর্মঘটে অংশ নিতে চলেছে সমগ্র শিক্ষা অভিযানের সমস্ত কর্মচারীবৃন্দ, যথা-শিক্ষাবন্ধু, পার্শ্বশিক্ষক, এসএসকে, এমএসকে, এ.এস, স্পেশাল এডুকেটর, কম্পিউটার শিক্ষক, কারিগরি শিক্ষক, অতিথি শিক্ষক প্রভৃতি। সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আশাকর্মী, আইসিডিএস, সিভিক, রন্ধন কর্মী প্রভৃতি। ভারতবর্ষের প্রায় দেড় কোটি কর্মচারী এই ধর্মঘটে অংশ নেবেন। মোট 16 দফা দাবির ভিত্তিতে এই ধর্মঘট। এই ধর্মঘটের সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে প্রকল্পের অধীনস্থ সমস্ত কর্মচারীদের আগামী ভবিষ্যৎ। স্বস্তির খবর এই যে, সমস্ত প্রকল্পের ক্ষেত্রেই একটি সর্বভারতীয় কমিটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে অর্থাৎ সমগ্র শিক্ষা অভিযানের ক্ষেত্রেও একটি সর্বভারতীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। আশা, আইসিডিএস, সিভিক,পার্শ্ব শিক্ষক সহ যৌথ নেতৃত্বের আহবানে এই ধর্মঘট। আসুন একবার দেখে নেওয়া যাক কি কি দাবির ভিত্তিতে সংগঠিত হতে চলেছে এই সাধারণ ধর্মঘট। প্রধান প্রধান দাবি গুলি হল- (এক) প্রকল্পের অধীনে নিযুক্ত সমস্ত কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন 21 হাজার টাকা করতে হবে। (দুই) ন্যূনতম পেনশন 10000 টাকা করতে হবে। (তিন) চাকরিতে যোগদানের দিন থেকে ইপিএফ প্রদান করতে হবে। (চার) কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবার থেকে একজনকে চাকরি দিতে হবে। (পাঁচ) প্রকল্পের অধীনে নিযুক্ত সমস্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে দ্রুত স্থায়ীকরণ করতে হবে। (ছয়) প্রকল্পের অধীনে নিযুক্ত যে সমস্ত কর্মচারীবৃন্দ কোভিডকে সামনাসামনি মোকাবেলা করছেন তাদের মৃত্যু হলে 50 লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পরিবার থেকে একজনকে চাকরি দিতে হবে। (সাত) রন্ধন কর্মীদের সাম্মানিক 10000 টাকা করতে হবে। (আট) রন্ধন কর্মীদের 12 মাস খাটিয়ে 10 মাসের সাম্মানিক দেওয়া চলবে না, 12 মাসেরই সাম্মানিক দিতে হবে, প্রভৃতি। ইতিমধ্যে ধর্মঘটের বিষয়ে ভারত সরকারকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলো এই ধর্মঘট কে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন এবং এই দাবিতে পথে নামছেন। ইতিমধ্যে ধর্মঘটের আগেই মনিপুর ও আসাম সরকার সমগ্র শিক্ষা অভিযানের সমস্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে স্থায়ীকরণের পথে হেঁটেছেন। সমগ্র শিক্ষা অভিযানের কর্মীদের আগেই স্থায়ীকরণ করেছেন পাঞ্জাব, গোয়া ও ওড়িশা সরকার। বিহার, রাজস্থান, ছত্রিশগড় সরকার স্থায়ীকরণের পথে হাঁটবেন বলে জানিয়েছেন। এখনো পর্যন্ত ভারতবর্ষের যে রাজ্যগুলি স্থায়ীকরণের পথে হাঁটেননি তাদের বেতন অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশ কয়েক গুণ বেশি। অর্থাৎ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য গুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থায় একমাত্র নিদারুণ। পশ্চিমবঙ্গ একমাত্র রাজ্য যাদের সরকারি কর্মচারীবৃন্দ দুবেলা পেট ভরে খেতে পারেন না। তাই আগামী ধর্মঘটের উপর নির্ভর করছে প্রকল্পের অধীনস্থ সমস্ত কর্মচারীদের ভূত ভবিষ্যৎ। প্রকল্পের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতনের একটি বড় অংশ শেয়ার করেন কেন্দ্রীয় সরকার, বাকি অংশ দেওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের শেয়ারতো দেনই না, উল্টে কেন্দ্রের দেওয়া টাকা আত্মসাৎ করছেন। আর কথায় কথায় 'একদেশ একআইন' বুলি আওড়ানো মোদি সরকার চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।উপরোক্ত প্রকল্পগুলি যেহেতু ভারত সরকারের অধীন, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে একেবারেই নির্লিপ্ত। মোদি সরকার 'ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি' চালু করার মধ্য দিয়ে সুকৌশলে হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন অনেকেই। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মতোই অভিসন্ধি মূলক। এক ধাপ এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যমনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সরকারি কর্মচারীদের মানুষ বলেই মনে করেন না। পশ্চিমবঙ্গে ন্যায্য দাবীতে কোনো গণ আন্দোলন সংগঠিত হলে তিনি পুলিশ লেলিয়ে দেন, বিনা বিচারে আটকের নির্দেশ দেন, লাঠি, গুলি, জলকামান চালানোর নির্দেশ দেন, এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়েছেন। অথচ তিনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন 2009 এ পার্শ্ব শিক্ষকদের অনশন মঞ্চে উপস্থিত হয়ে তিনি দাবি করেছিলেন অন্য রাজ্যে বেতন বেশি এরাজ্যে কম কেন ? অর্থাৎ আগাগোড়াই তাঁর ভূমিকা দ্বিচারিতায় ভর্তি। বর্তমানে তিনি ইংরেজদের অনুসৃত পথ 'ডিভাইড এন্ড রুল'কেই পথের সাথী করেছেন। তবে এটি বিশেষভাবে শিক্ষা বন্ধুদের ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত মানবিক তিনি বেতন বৃদ্ধি করতে চান কিন্তু ম্যানেজমেন্টের জন্য বেতন বৃদ্ধি করতে পারছেন না। পশ্চিমবঙ্গের তিন-চারজন মন্ত্রী কে বাদ দিয়ে কেউ তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারেন না অর্থাৎ তিনি বেতন বৃদ্ধি করলে কোনো মন্ত্রী পর্যন্ত তা আগাম জানতে পারেন না। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তিনিই শেষ কথা বলার মালিক। অথচ সুকৌশলে ম্যানেজমেন্টের দোহাই দিয়ে তিনি ধোয়া তুলসীপাতা সাজার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ সব রাগ গিয়ে পড়ছে ম্যানেজমেন্টের উপর। ম্যানেজমেন্ট স্টাফরা আজ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে দেখা পর্যন্ত করতে পারেননি, এমনকি তাদের একটি দাবিও পূরণ হয়নি। এহেন স্বৈরাচারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ম্যানেজমেন্ট স্টাফদের দোষ দিয়ে সুকৌশলে নিজে জনদরদি থেকে গেছেন। এক্ষেত্রে অবশ্য সরকারি কর্মচারী বৃন্দই দায়ী, তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে চিনতে পারেননি। পৃথিবীতে এমন কোনো অনৈতিক কাজ নেই যা তিনি করতে পারেন না। তাকে চেনা অত্যন্ত মুশকিল। প্রবাদে আছে 'এক ঢিলে দুই পাখি মারা ', আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একঢিলে 17 পাখি মারেন। যেহেতু আগামী 7ও 8 আগস্টের ধর্মঘটে আশা কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন,তাই তিনি একটি ফেক নিউজ আশা কর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বলা হচ্ছে তিনি চলে যাওয়ার আগে আশা কর্মীদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়ে যাবেন। আসলে সুকৌশলে তিনি আশা কর্মীদের এই ধর্মঘট থেকে বিরত করার চেষ্টা করছেন। এটা তাঁর অত্যন্ত পুরনো কৌশল। তবে এবারের ধর্মঘটে ট্রেন, বাস, ট্রাম ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়নি। ধর্মঘটে নেই রাস্তা অবরোধও। উপরোক্ত সমস্ত কর্মচারীবৃন্দ তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ধর্মঘট পালন করবেন এবং সর্বোচ্চ আধিকারিকের কাছে স্মারকলিপি জমা দেবেন। স্মারকলিপির কপি বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও ফেসবুকে দিয়ে দেওয়া হবে, সেখান থেকে বের করে স্মারকলিপি জমা দিতে হবে। আগামী 7 ও 8 আগস্ট শুক্র ও শনিবার, কোভিড পরিস্থিতিতে শনিবার এমনিতেই অফিস বন্ধ তাই আন্দোলনকারীদের হাতে থাকছে একমাত্র শুক্রবার, ঐদিন সমস্ত কর্মচারীবৃন্দ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অথবা যৌথভাবে স্মারকলিপি জমা করবেন। স্মারকলিপি জমা করার পর সেটা বিভিন্ন গ্রুপ, সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক, প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াকে ব্যবহার করে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে হবে।

0/Post a Comment/Comments

Previous Post Next Post
Contact for advertising : 9831738670