এটাই কী সংসদীয় গণতন্ত্র?* *✍️কম‌লে‌শের কলম,





*স্বাধীন ভারতের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়ার অন্যতম প্রধান দিক হলো ভোটাধিকার ক্ষমতা দেওয়া।*

*এই ভোটাধিকার ক্ষমতা দেওয়ার মধ্যে দেশের সকল প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষদের প্রতি যেমন সমতা নিয়ে আসার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল বা হয়েছে ,তেমনি আছে নানা সামাজিক বৈষম্য দূর করার একটা প্রচেষ্টা। আর তাই সংবিধান প্রণেতারা যখন সংবিধান রচনা করেছিলেন তখন তারা এইসব বিষয়গুলো মাথায় রেখেছিলেন এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথকে প্রশস্ত করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন বা বুঝতে পেরেছিলেন গণতান্ত্রিক ভারতের আত্মা "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যতে" বিরাজ করে , তাই ভারতের এত বিভিন্ন ধর্মের, জাতির ,লিঙ্গের এবং আর্থ সামাজিক বিভিন্নতা থাকা সত্বেও তারা দেশ গঠনে সকলের সমান অংশগ্রহণের পথকে প্রশস্ত করেছিলেন ,যা বিগত ৬৮ বছরের বেশি সময় ধরে ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।*
*তবে বর্তমানে বেশ কিছু দশক ধরে রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিদের চরিত্রের ও নীতির চূড়ান্ত অধঃপতন ঘটেছে ,যার ফলে আমজনতা হারাচ্ছে তাদের সাংবিধানিক অধিকার। অর্থাৎ জনগন তাদের ভোটাধিকারবলে সরকার গঠন করার যে অধিকার ভোগ করতো তা যা অত্যন্ত হতাশাজনক স্তরে পৌঁছে গিয়েছে বলে আমি মনে করি।*

*বর্তমানে নির্বাচনের সময় আপনি আপনার , পছন্দের রাজনৈতিক দলের আদর্শের, নীতির বশবর্তী হয়ে সেই বিশেষ দলের পক্ষে আপনার মূল্যবান ভোট দিলেন এবং সেই দলের প্রার্থী আপনার মতো আরও অনেক হাজার হাজার, বা লক্ষ লক্ষ ভোটারদের ভোট লাভ করে জয়লাভ করলো। আপনি ভাবলেন যাক আপনার আদর্শের জয় হলো, আপনি যেভাবে দেশে বা রাজ্যে বা স্থানীয় পঞ্চায়েত স্তরে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চান সেই পথই সুগম হলো। কিন্তু আদৌ কি তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ঘটছে?*

*যে ব্যক্তিকে বা দলকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করলাম আমরা, তারাই আবার বিরোধী পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরকার গঠনে তৎপরতা দেখাচ্ছে ও সরকার গঠন করছে । ভোটের ময়দানে রাজনৈতিক দলগুলি যারা একে অপরের উপর নানা রাজনৈতিক কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি বা অভিযোগ করে জনগণকে প্রভাবিত করার জন্য, তারাই আজ একই সাথে,একই ছাদের তলায় বসে সন্ধিস্থাপন করছে এবং ক্ষমতা বণ্টন করছে, একভাবে ব্যাক্তিগত লাভের চেষ্টা করছে।*
*অর্থাৎ আপনার মূল্যবান ভোটটা যে বিশেষ রাজনৈতিক দল তা সে বাম বা ডান বা দক্ষিণ পন্থী যে কোন দলের পক্ষে দেওয়া হল তাদের আদর্শ ও দেশ সেবা দেখে তা যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।*

*ভোটের পূর্বে জোট হওয়ার মধ্যেও তাও কিছুটা নৈতিকতা থাকে কারণ সেখানে জনগণ ভোট দেওয়ার আগে পর্যন্ত জানতে পারে তাদের পছন্দের দলের জোট সঙ্গী কারা হতে চলেছে।*

*কিন্তু বর্তমানে ন্যায়-নীতিবিহীন যে সকল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দল ক্ষমতার অলিন্দে থাকার জন্য মিত্রতা স্থাপন করছে, ঘোরাফেরা করছে তাদের প্রতি ভোটদাতা জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা একপ্রকার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আর এইভাবে চলতে থাকলে আমরা কি আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারব বলে মনে করতে পারি? এই কি সেই সংসদীয় গণতন্ত্র যার জন্য তৈরি হয়েছিল বিশেষ সংবিধান? জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিরা যখন তার দল ত্যাগ করে অন্য দলে যোগদান করে, তখন তারা কী জনগণের সিদ্ধান্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে না?*
*আজ আমরা জনগণ সরকার গঠনে যে এক প্রকার "কাগুজে বাঘে" পরিণত হয়েছি তা প্রায় সকলের কাছেই জলের মতো স্বচ্ছ। আমি আপনি আছি শুধু ভোটার লিস্টে এবং ভোট দেওয়ার মধ্যে, তার পরবর্তী ক্ষেত্রে যারা আমাদের ভোটে জয়যুক্ত হচ্ছে সেইসব প্রার্থীরা তাদের পছন্দমতো যেটা ভালো বুঝছে সেটাই ঠিক করে চলেছে। নীতি ও আদর্শকে বিসর্জন করে তাদের ক্ষমতা ভোগ করার যে মরিয়া চেষ্টা আমরা আমাদের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি তাতে আমরা কি হতাশ হচ্ছি না?*

*ভাবতে অবাক লাগে এই রাজনৈতিক দল গুলির সাধারণ সমর্থক হয়ে কতশত সাধারণ মানুষ গলা ফাটায়, নেতাদের পেছনে পেছনে ঘোরে, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সঙ্গে হাতাহাতি, মারামারি, এমনকি ভোটের ময়দানে বা মিছিলে একত্রিত হয়, পরবর্তীতে তারা রাজনৈতিক হানাহানি বা এমনকি শহীদও পর্যন্ত হয়। তাহলে আমরা আজ কতটা নির্বোধ বা এই সমস্ত রাজনৈতিক দল আমাদের সাধারণ জনগণকে কতটা বোকাতে পরিণত করেছে তা বুঝতে বিশেষ কিছু বুদ্ধির দরকার পড়ে কী?*

*এটাই কি বর্তমানে ভারতীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্রের নগ্ন চিত্র? আমার অর্থাৎ নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কি আদৌ রক্ষিত হচ্ছে? কিছু ক্ষমতালোভী, অর্থ উপার্জনকারী ,নিকৃষ্টমানের ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত বা পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলি যে তাদের ব্যবসা করছে জনগণের সেবার মাধ্যমে তা আর বুঝতে কারও বাকি নেই ।আর এই সমস্ত ব্যক্তিদের যারা সমর্থন করছে বা যারা তাদের দলে যোগ দিচ্ছে জনগণের সেবার লক্ষ্যে তারা যে আদতে কমিশন নেওয়া দালাল তা আমরা বলতেই পারি ।যেখানে যে যত জনগণকে ভাওতা দিয়ে শান্ত করে রাখতে পারবে ,তারা সেই অনুপাতে পাবে তার লভ্যাংশ।*

*একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি দল ত্যাগ করার মাধ্যমে সমাজে কি বার্তা যায়? এখানে কি আমাদের সর্বোচ্চ আদালত কোনো ভূমিকা নিতে পারে না নাগরিকদের মৌলিক ভোটাধিকারের ?এইভাবে দিনদিন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কি শেষ হচ্ছে না? কোটি কোটি টাকা খরচ করে বছরের-পর-বছর নির্বাচন করার কি আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে?*

*এইভাবে তো আমরা কোন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব কি সমাজে? বর্তমানে নাগরিক সমাজ এই বিভিন্ন নির্বাচিত সদস্যদের দল পরিবর্তনের খেলা দেখে আগামী দিনে নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারবে তো? নির্বাচিত প্রাথীদের নিরপেক্ষতা বা স্বচ্ছতা কোথায়? কেন এইসব প্রতিনিধিদের প্রতিনিধি পদ বাতিল করা হয় না প্রথমেই?*

*আমাদের এই নির্বাচনী ব্যবস্থার বা রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থার নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমি দেখতে পাই না,কিন্তু আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত নাগরিক ভাবি, যারা সত্যিই চাই দেশজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কাজের প্রতি স্বচ্ছ হোক, তারা যদি আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার ব্যবস্থাকে সংস্কারের পক্ষে জোরালো সওয়াল না করি, তাহলে আগামী দিনে এই ভ্রষ্ট রাজনৈতিক দলগুলি সম্মিলিতভাবে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে এবং নাগরিকদের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার যে তারা গ্রাস করবে।*

0/Post a Comment/Comments