মাদ্রাসা প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বাবুর দেওয়া "সন্ত্রাসবাদীর আস্তাকুঁড়" তকমা ঘুঁচবে কি?





আবদুর রউফ

সালটা ২০০২, ফেব্রুয়ারী মাস৷ পশ্চিমবাংলায় গগনভেদী চিৎকারে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের বিবৃতি- "বাংলার মাদ্রাসাগুলো সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর, বিশেষকরে সীমান্তবর্তী মাদ্রাসাগুলি"৷ 

অমনি শুরু হয়েছিল মিডিয়া সন্ত্রাস৷ বাংলার আনাচে কানাচে গায়ের ঘাম ঝরিয়ে ছুটে বেড়িয়ে সাংবাদিক নামের সাংঘাতিকগুলো জোগাড় করেছিল নিজেদের সাজানো সংবাদ৷ আরবী ভাষার বর্নপরিচয় ' আরবী কায়েদা, আম্মাপারা' ইত্যাদি নিয়ে সংবাদ জগতের সেকি কোলাহল৷ 



যার বলি হয়েছিলেন তৎকালীন বিথারী সিনিয়র মাদ্রাসার আপাত নিরীহ শান্ত সুযোগ্য শিক্ষকত্রয়, আমার বন্ধুবর শিক্ষক আহসানুল ইসলামের আব্বা মাওলানা কোরবান আলি সাহেব৷ সংবাদে প্রকাশ নাকি কোরবান আলি সাহেবের মটর সাইকেলটি জঙ্গিরা কাজে লাগিয়েছিল৷ একই সাথে বিথারী সিনিয়র মাদ্রাসার আরো দুজন শিক্ষক, মাওলানা মোজাম্মেল সাহেব এবং মাওলানা আবদুল গফুর সাহেবদ্বয়কেও আটক করা হয়েছিল, পরবর্তীতে প্রত্যেকেই নির্দোষ প্রমানিত হয়েছিলেন৷৷ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠিতলব্ধ শিক্ষকত্রয়কে বুদ্ধদেববাবুর অপরিণত বক্তব্যে কতটা মারাত্মক পরিস্থিতির সন্মুখীন হতে হয়েছিল, সেটা আমরা পরবর্তীতে অনুধাবন করতে পেরেছি৷
এরপরও সাংবাদিক, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, প্রিন্টিং মিডিয়া, লোকপ্রচার মিডিয়া, লোকাল কমিটির মাতব্বরসহ তৎকালীন রাজ্য সরকার ( আলিমুদ্দিন) পরিচালিত গোয়েন্দা সংস্থা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমনভাবে আক্রমন শানিয়েছিল আজকের দিনে কল্পনা করা যায় না৷ যা কখনো মুসলিমরা ভাবতেও পারত না৷


 সেইসব সংবাদ মুখরোচকভাবে আম বাঙালীকে খাওয়ানো হয়েছিল, যার উৎস ছিল বুদ্ধদেব বাবুর উদ্দেশ্য প্রণোদিত মন্তব্য৷ দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে হলুদ মিডিয়া মাদ্রাসা গুলি থেকে আলকায়েদার (আরবী বর্নপরিচয়- বোগদাদী কায়েদা) বই পাওয়া গেছে, নিয়মিত জঙ্গি প্রশিক্ষন হয়, মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া দরকার, সেইসাথে আজকের বামপন্থী নামের অবসরপ্রাপ্ত কমরেড সকল, মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে বলে উল্লিখিত বামসম্রাটের পিছুপিছু লেজ নাড়তে শুরু করেছিল৷ একদশক পরেই উপযুক্ত জবাব পেয়ে নাকাল হয়ে ঘরে বসে আছে৷ 

যাইহোক, মূল কথায় আসা যাক৷ মাদ্রাসাগুলি জঙ্গি তকমা ঘুচিয়ে পরবর্তি প্রায় এক দশক মাদ্রাসা ও মাদ্রাসাশিক্ষা ব্যবস্থা সমাজের মূল স্রোতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে৷ সংখ্যালঘু পড়ুয়ার পাশাপাশি সংখ্যাগুরু পড়ুয়ার সংখ্যাও দিনকেদিন বেড়েই চলেছে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়মিত স্মার্ট প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কসপ, স্মার্ট ক্লাসরুম, খেলাধূলা সর্বক্ষেত্রে মাদ্রাসা পড়ুয়ারা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে৷ এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক৷ পর্ষদ পরিচালিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট গভর্নিং বডি সরকারী নিয়মানুসারে তৈরী হয় ও রাজ্যের মাদ্রাসাগুলি পরিচালনা করে৷ ইতিমধ্যে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, পর্ষদের মাথায় অনেক পূন্যবান ব্যক্তিত্বের অভিষেক ঘটেছে৷ প্রত্যেক প্রেসিডেন্টই নিজ নিজ কর্মদক্ষতার মধ্য দিয়ে মাদ্রাসা বোর্ডকে নতুন নতুন দিশা দেখিয়েছেন৷ তাদের মধ্যে অনেকেই মহৎপ্রান ব্যাক্তিত্ব, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম বর্তমান মাদ্রাসা বোর্ড প্রেসিডেন্ট ' আবু তাহের কামরুদ্দিন সাহেব'৷ আপাত ভদ্র শান্ত কাজের মানুষ হিসাবেই সুপরিচিত৷ বড়কাজের ক্ষেত্রে কখনও কখনও কিঞ্চিৎ অজ্ঞাত ও অসতর্কতার দুএকটি উদাহরন থাকলেও থাকতে পারে৷ তারপরও মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে নিবিড় সম্পর্কিত সভাপতি অত্যন্ত যত্নশীল ও দায়ীত্বের সাথে বোর্ডকে আধুনিক মানের করে তুলতে প্রয়াসী হয়েছেন৷ তাঁর কর্মদক্ষতা বর্তমানে সর্বজনবিদিত৷ প্রশাসনিক প্রধানের দায়ীত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি একজন সামাজকর্মী ও বটে৷ 



বর্তমানে রাজ্যের প্রত্যেকেই বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সদা প্রস্তুত, লকডাউন পরিস্থিতিতে রাজ্যের মানুষের হাতে কাজ নেই, বাইরে বের হয়ে রোজকারের পরিস্থিতি তৈরী করাটাও আকাশকুসুম কল্পনা৷ সাধারন প্রান্তিক শ্রেনীর মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরন করাটা এই মুহুর্তে অত্যন্ত জরুরী৷ রাজ্য সরকার সহ কেন্দ্রীয় সরকার সারাদেশব্যাপী আপাতকালীন জরুরী অবস্থা জারি করেছে৷ অহরহ মানুষ করোনা কবলিত হয়ে হসপিটালাইজড হচ্ছে, তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা পরিষেবা দিতে রাজ্য সরকার সচেষ্ট৷ অর্থনৈতিক ঘাটতির কারনে রাজ্যের কোন মানুষ যাতে আরো বিপদে না পড়ে সেজন্য মানুষের চাহিদা মেটাতে রাজ্যসরকার ত্রান তহবিল গঠন করেছেন৷ বড় বড় শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, দাতা, সংস্থা, শিক্ষক, ডাক্তার, চাকুরিজীবী, কলাকুশলী সকলের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন৷ ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ রাজ্য ত্রান তহবিলে দানের হাত প্রসারিত করেছেন৷ 

আমার জানামতে রাজ্য সরকারের ঘোষিত ত্রান তহবিলে বাংলার অনেকগুলি শিক্ষাপর্ষদের মধ্যে মাননীয় কামরুদ্দিন সাহেব পরিচালিত বর্তমান মাদ্রাসা পর্ষদ লক্ষনীয় ও শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন৷ জনাব কামরুদ্দিন সাহেবের প্রচেষ্টায় মাদ্রাসা বোর্ডের পক্ষ থেকে দশ লক্ষ টাকার চেক মুখ্যমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে দান করে বাংলার মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন৷ যদিও বামপন্থীদের কাছে এটা হয়ত আজও পূর্বধারনার জন্য ইস্যু হিসাবে ধরা দিতে পারে৷ তবুও এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও মানবতাবাদী কাজ৷ একজন মাদ্রাসা শিক্ষক হিসাবে নিজেকে ধন্য মনে করছি৷ আর হয়তো কোনদিন মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে 'সন্ত্রাসবাদের আস্তাকুঁড়' বলে গালি শুনতে হবে না৷ 

ধন্যবাদ পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদকে, ধন্যবাদ পর্ষদ ম্যানেজমেন্টকে, ধন্যবাদ সভাপতি মাননীয় আবু তাহের কামরুদ্দিন সাহেবকে৷ 

আবদুর রউফ
সহকারী শিক্ষক
মৌলানা আবুল কালাম আজাদ মেমোরিয়াল হাই মাদ্রাসা৷
ছোটদীঘা, ছোটজাগুলিয়া, দত্তপুকুর, উত্তর ২৪ পরগনা৷

0/Post a Comment/Comments

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com